উচ্চাকাঙ্ক্ষা যখন আদর্শের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তখন তার অভিঘাত আর শুধু একজন মানুষের জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার আঁচ এসে লাগে সম্পর্ক, শিল্পীসত্তা, এমনকি আত্মপরিচয়েও। শেক্সপিয়রের ‘ম্যাকবেথ’-এর এই চিরন্তন দ্বন্দ্বকেই সমকালীন পরিসরে নতুন করে দেখার চেষ্টা করেছে সাউথ গরিয়া আনন্দ মহল থিয়েটার গ্রুপের নতুন প্রযোজনা ‘রক্তচন্দ্রিমা’। গত ১৩ সেপ্টেম্বর মুক্ত অঙ্গন রঙ্গালয়ে নাটকটির প্রথম মঞ্চায়ন সম্পন্ন হল।
সব স্বপ্নের পিছনে কি থাকে সাফল্যের আলো? নাকি সেই আলোর আড়ালেই ধীরে ধীরে জমতে থাকে অন্ধকার? ‘রক্তচন্দ্রিমা’ মূলত সেই অন্ধকারের দিকেই তাকায়। শেক্সপিয়রের ‘ম্যাকবেথ’-কে সূত্র হিসেবে গ্রহণ করলেও নাটকটি তার অনুসরণে আটকে থাকে না। রাজনীতি, ক্ষমতা কিংবা রাজসিংহাসনের বদলে এখানে উঠে আসে থিয়েটারের মঞ্চ, একজন শিল্পীর আদর্শ এবং তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী নারীর আকাঙ্ক্ষা। ফলে ‘ম্যাকবেথ’ এখানে কাঠামোগত আধার মাত্র; আসল কথাটি সমকালের—শিল্প, সাফল্য এবং ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার সংঘাত।
নাটকের অন্যতম শক্তি তার অভিনয় এবং নির্দেশনা। নির্দেশনার দায়িত্বে সৌরভ মুখোপাধ্যায়, সহকারী নির্দেশনায় ইন্দ্রানী পাল। নির্দেশনার পাশাপাশি দু’জনের অভিনয়ও নাটকটিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কেন্দ্রীয় চরিত্রে সৌরভের অভিনয়ে আদর্শবাদী শিল্পীর অন্তর্দ্বন্দ্ব ধরা পড়েছে। তবে বেশ কিছু জায়গায় তাঁকে ছাপিয়ে গিয়েছেন সুরভি দত্ত। চন্দ্রিমা চরিত্রে তাঁর অভিনয় নাটকের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। লেডি ম্যাকবেথের আদল থেকে নির্মিত হলেও চরিত্রটিকে নিছক অনুকরণে আটকে না রেখে নিজের স্বাতন্ত্র্যে প্রতিষ্ঠা করেছেন সুরভি। উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আবেগ এবং নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছাকে তাঁর অভিনয় বেশ দক্ষতার সঙ্গে বহন করেছে। ফলে চন্দ্রিমাই ধীরে ধীরে নাটকের ভরকেন্দ্রে পরিণত হয়।
আহেলির চরিত্রে ইন্দ্রানী পালের অভিনয়ও সংযত এবং বিশ্বাসযোগ্য। অন্য দিকে, তুলনায় ছোট পরিসরে রনজয়ের চরিত্রে সায়নদীপও নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন। চরিত্রগুলির পারস্পরিক টানাপোড়েনই নাটকের নাটকীয়তা তৈরি করে এবং অভিনয় সেই দ্বন্দ্বকে যথেষ্ট জোরালো করে তুলেছে।
তবে ‘রক্তচন্দ্রিমা’র সাফল্য শুধু অভিনেতাদের উপর নির্ভরশীল নয়। নেপথ্য নির্মাণও নাটকটির আবহ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। অর্ক মুখোপাধ্যায়ের আবহ-নির্মাণ সংলাপের বাইরে নাটককে একটি পৃথক ভাষা দিয়েছে। শব্দের ব্যবহার কখনও দৃশ্যের উত্তেজনা বাড়িয়েছে, কখনও চরিত্রের অন্তর্লোককে স্পষ্ট করেছে। সায়ন্তন মুখোপাধ্যায়ের আলোক পরিকল্পনাও মঞ্চের আবহ তৈরিতে কার্যকর। আলোর প্রক্ষেপণে তৈরি হয়েছে নাটকীয়তা, যদিও সীমিত পরিসরের মঞ্চে আলোর সম্ভাবনা আরও খানিকটা বিস্তৃতভাবে ব্যবহারের সুযোগ ছিল।
অল্প আয়োজনের মধ্যেও মঞ্চ নির্মাণ দৃষ্টিনন্দন। এখানে জাঁকজমকের বদলে প্রয়োজন ও নাট্যভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার চেষ্টা স্পষ্ট। সব মিলিয়ে ‘রক্তচন্দ্রিমা’ একটি পরিচিত শেক্সপিয়রীয় দ্বন্দ্বকে সমকালীন থিয়েটারের ভিতরে এনে নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। সাফল্যের জন্য শিল্পী কতটা দূর যেতে পারেন, আর সেই পথ পেরোতে গিয়ে কী হারিয়ে ফেলেন—নাটকটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত সেখানেই। আনন্দ মহল থিয়েটার গ্রুপের এই প্রযোজনা সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেয়ে দর্শককে তার সামনে দাঁড় করাতেই বেশি আগ্রহী।































