রবিবার, ২৫ জুন, ২০২৩

দশমবর্ষ পূর্তিতে টালিগঞ্জ স্বপ্নমৈত্রীর আয়োজনে 'দশম বর্ষ - দশ পর্যায়'

কলকাতা এবং অন‍্য জেলায় যেসব বড়,ছোটো,মাঝারি যত নাট‍্যদল আছে  তাদের যদি একটি তালিকা তৈরী করা হয় সেখানে টালিগঞ্জ স্বপ্নমৈত্রীর নাম থাকলে অবাক হবার কিছু নেই। কারণ একটা দল বিগত দশ বছর ধরে অনেক প্রতিকুলতার মধ‍্য দিয়ে তারা সৎ ভাবে নাট‍্য চর্চা করে চলেছে । নাটকের বিভিন্ন আঙ্গিকে তারা পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাচ্ছে। একটাই উদ্দেশ্য, দর্শককে থিয়েটারমুখী করতে হবে। 

স্বপ্নমৈত্রীর এবার দশ বছর। 'দশম বর্ষ দশ পর্যায়'-টালিগঞ্জ স্বপ্নমৈত্রীর এবারের  ভাবনা। গত ১৪-১৫ই জুন ছিল পঞ্চম পর্যায়। এই দু দিন অন্তরঙ্গ ও মঞ্চ থিয়েটারের মধ‍্য দিয়ে তারা পঞ্চম পর্যায় উদযাপন করলো। প্রথম দিন(১৪ই জুন) তৃপ্তি মিত্র নাট‍্য গৃহে প্রযোজিত নাটকগুলি ছিল -"আলোর খোঁজে"(হযবরল- চাকদহ),"মধুবংশীর গলি"(নহলী)এবং সর্বশেষ নিবেদন রিষড়া দূরায়ন প্রযোজিত নাটক "ফেক গম্ভীরা"। 

বিষয় ভাবনার দিক থেকে তিনটি নাটক তিন ভিন্ন স্বাদের। কিন্ত তিনটি প্রযোজনার ক্ষেত্রে মিল একটাই, নাটকগুলি আমাদের ভাবায়, আমাদের চেতনার মূলে নাড়া দেয়। পরের দিন(১৫ই জুন) মধুসূদন মঞ্চে নাটকগুলি ছিল "লুকোচুরি"( স্বপ্নমৈত্রী),"সুখের খোঁজে"(একটি প্রযোজনা),"বাজাও তোমার একতারা"(নবীন-সৈদাবাদ)। এখানেও তিনটি নাটক এক কথায় অনবদ‍্য। টালিগঞ্জ স্বপ্নমৈত্রীর "লুকোচুরি" নাটকটির এদিন ছিল তিরিশতম অভিনয় । পুরোনো-নতুন মুখ মিলিয়ে প্রায় দশ-বারো জন মঞ্চ মাতিয়ে দিল।

পরিশেষে বলি টালিগঞ্জ স্বপ্নমৈত্রীর এই বিশাল কর্মকান্ডকে সাধুবাদ জানাই । তাদের এই সৎ নাট‍্য যাপন বাংলা নাটককে আরো সমৃদ্ধ করবে এই আশা রাখি। 

শনিবার, ১৭ জুন, ২০২৩

কালীতলা স্পেসে কাঁকিনাড়া শিল্পাঙ্গনের রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন

কালীতলা স্পেসকে ঘিরে কাঁকিনাড়া শিল্পাঙ্গন তাদের নাট্য যাপন চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। তার ব্যতিক্রম হয়নি রবীন্দ্রজয়ন্তী অনুষ্ঠানে। খুব সাধারণভাবে সাদামাটা ছাপোষা কিন্তু আন্তরিকত ও ভালোবাসায় ভর করে কাঁকিনাড়া শিল্পাঙ্গন নাট্য সংস্থা পালন করলো রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপন অনুষ্ঠান কালীতলা স্পেসে গত ১৪ই মে ২০২৩..সহযোগিতায় 'থিয়েটার মগজ পত্রিকা' ও মাদরাল কল্যাণ সমিতি এবং এলাকার সকল মানুষ। এলাকার মানুষের উদ্দীপনা ও চাহিদাতেই যেন কালীতলা থিয়েটারের স্পেস নতুন রূপে রূপায়িত হয়েছে। 

ইছাপুরের কৃষ্ণ বর্মনের সঞ্চালনায় শুরু হয় রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠান। বিশিষ্ট অতিথি শিক্ষিকা লীনা পাঠক মহাশয়া প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে শুভ সূচনা করেন। কাঁকিনাড়া শিল্পাঙ্গনের সকল সদস্য ও অন্যান্যরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে তাঁর চরণ উদ্দেশ্যে পুষ্পার্ঘ্য জ্ঞাপন করে শুরু করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। 'নৃত্য সুধা ডান্স স্কুল', 'সৃজনী নৃত্যকলা কেন্দ্র', 'দ্বীপ ঝংকার নৃত্যাঙ্গন', 'নৃত্যবালু' এবং এলাকার খুদে ও বড়রা মিলে নাচের তালে মাতিয়ে তোলে মঞ্চ। রবীন্দ্রগানে নুপুরের ঝংকার যেন সেদিন অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিল উপস্থিত সকল দর্শকের মনে। 

রবীন্দ্রসঙ্গীতের মাধ্যমে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করলেন রুদ্রপ্রিয়া মিত্র। এলাকার ছোট্ট শিশুরা খুবই সরলভাবে তাদের ভালোবাসা জানায় বিশ্বকবির উদ্দেশ্যে সুন্দর আবৃত্তির মাধ্যমে। কবিগুরুর লেখা একটি নাটক "স্ত্রীর পত্র", যা চলতি সমাজ ব্যবস্থার চিরকালীন অমানবিকতার ঝলসানো বহিঃপ্রকাশ, শ্রুতি নাটকের রূপে অপূর্বভাবে পরিবেশন করলেন 'সুকথা' শ্রুতিনাট্যদল। প্রতিবারের ন্যায় এবারেও কাঁকিনারা শিল্পাঙ্গনের খুদেরা নাচ দিয়ে শুরু করে তাদের প্রতিভার চমক। কাঁকিনাড়া শিল্পাঙ্গন নাট্য সংস্থার কর্ণধার রাজা দে -র পরিচালনায় ও কাঁকিনাড়া শিল্পাঙ্গন এর প্রযোজনায় পরিবেশন হয়  নাটক "অন্তেষ্টি সৎকার" । যেখানে বাচ্চাদের চমকপ্রদ অভিনয় মুগ্ধ করে এলাকাবাসীদের। 

এ অপূর্ব অনুষ্ঠানের ইতি টানেন সুন্দরবনের দুই গুণী মানুষ বাপ্পা ও অনির্বাণ। তাদের খোলা গলায়, উকুুলেলে ও গীটার হাতে নিয়ে বাউলের সুরে মাতিয়ে তোলে সকল দর্শকের বাঁধনঘেরা প্রাণ। তাইতো ইতি হয়েও হয় না ইতি, এইতো মোদের পরিচিতি। কাঁকিনাড়া শিল্পাঙ্গন নাট্য সংস্থার কর্ণধার রাজা দে জানান - ”এলাকার মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক পরিধি বৃদ্ধি করতে সবসময় চেষ্টা থাকে। এবং দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় তা অনেকটা এগিয়েছে।।"


শুক্রবার, ৯ জুন, ২০২৩

বাংলাদেশ ও ভারতের নাটক একসাথে বোলপুর শান্তিনিকেতনের পঞ্চবনে

ওই পারে পদ্মা আর এই পারে গঙ্গা মাঝে কাঁটাতারের বেড়াজাল থাকলেও থিয়েটারের মাধ্যমে এই কাঁটাতার ছিড়ে গিয়েছিল রাজা রামমোহন রায়ের জন্ম দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক নাট্য সন্ধ্যায়। নাট্য সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়েছিল প্রান্তিক স্টেশনের কাছে পঞ্চবন রিসোর্টের খাপছাড়া প্রাঙ্গনে। উদ্যোক্তা তপন মল্লিক। সহযোগিতায় অনন্ত বিশ্বাস।

সেই দিন আমাদের দল অর্থাৎ কলকাতা রঙ্গশীর্ষ সেখানে উপস্থিত ছিল ‘ভাসান’ নাটককে সাথে নিয়ে।নাটকের নেপথ্যে ছিল পৃথা ভট্টাচার্য, মনোজিৎ মিত্র ও চিরঞ্জিত বড়াই।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ অর্থাৎ বাংলাদেশের থেকেও একটি নাট্যদল এসেছিল তাদের প্রয়াসকে সকলের সামনে তুলে ধরতে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা তাদের নাটক ‘শূন্য সময়ের পথে’ প্রদর্শন করে। নির্দেশনায় ছিলেন অনিমেশ সাহা লিটু।

পঞ্চপন রিসোর্টে প্রতি শনিবার করেই এই রূপ নাট্য সন্ধ্যা আয়োজিত হয়ে থাকে।আমরাও তাদের নিমন্ত্রণে সেখানে দ্বিতীয় বারের জন্য গিয়েছিলাম। ওখানকার দর্শক যেমন ভালো ছিল তেমনই সুন্দর ছিল সেখানকার পরিবেশ। অন্য সব জায়গার মতন এই দিনের অনুষ্ঠান কোন প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে শুরু হয়নি, শুরু হয়েছিল সেই অঞ্চলেরই একজন বাউল সাধিকার বাউল গানের মাধ্যমে। তারপর আমরা আমাদের প্রতিবেশী দেশের নাট্য বন্ধুদের প্রদর্শন করা নাটক দেখেছিলাম। তারা রাজা রামমোহন রায়ের নানান কর্মকাণ্ড সংক্ষিপ্ত আকারে একটি নাটকের মাধ্যমে প্রকাশ করতে চেয়েছিল তার সাথে আধুনিকতার ছোঁয়াও ছিল কিছুটা, তা আমার মনে হয়েছে যথাযথভাবেই প্রকাশিত হয়েছে এবং তাদের অভিনয়ও যথেষ্ট ভালো ছিল। এরপর আমাদের নাটক অর্থাৎ ভাসান প্রদর্শিত হয়েছিল। বেশ সুষ্ঠুভাবে এবং বহু দর্শকের সমাগমে আমাদের নাটক যেন এক অন্য মাত্রা পেয়েছিল। নাটক শেষে কিছু সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতে হয়েছিল আমাদের সকলকে। তবে অনুষ্ঠান শেষে সমস্ত দর্শক চলে গেলেও আমাদের অর্থাৎ দুই দেশের নাট্য বন্ধুদের নিয়ে নাটকের আড্ডা এবং গান সাথে খাওয়া-দাওয়া চলেছিল বহুরাত পর্যন্ত। এক কথায় জমজমাট ভাবে কেটে গিয়েছিল সেই দিনটা যা কিনা মনের মনি কোঠায় আজও অমলিন।



মঙ্গলবার, ৬ জুন, ২০২৩

গত ২রা জুন তৃপ্তি মিত্র নাট্য গৃহে বিভাবন এর "Nothing to say " দেখে তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অভিনেতা ভাস্কর বনিক

আমাদের দৈনন্দিন জীবন যাপন খুব একটা সরল নয়। আমাদের স্বপ্ন মাফিক আমরা কিছু করতে চাইলে বহু ক্ষেত্রে আমাদের বাধা দেওয়া হয়, সেটা Consciously হোক আর unconsciouslyই হোক। তখন আমাদের খুব একটা কিছু বলার থাকে না বা বলা চলে কি বলবো বা কি করবো বুঝে উঠতে পারি না আমরা কেউই অর্থাৎ ‘Nothing to say’। কারণ আমাদের গোটা সিস্টেমটাই আমাদের এমন ভাবে মুখ চেপে ধরে বসে আছে যেখানে টিভি চালানোর পর সবার প্রথমেই একটা বিশেষ রাজনৈতিক দলের তোষামোদ করা একটা খবরের চ্যানেল জোর করে দেখতে হয়, আমরা না করতে পারিনা। 

এখানে ‘আমরা’ বলতে কিন্তু শুধুমাত্র ‘শিল্পী’দের কথা আমি বলছি না, বলছি ওই চাষিটার কথাও যে প্রত্যেক বছর স্বপ্ন দেখে এবার অন্তত লাভের মুখ দেখবে। আদৌ কি তার রোদে পুড়ে ফেটে যাওয়া মুখটা ‘লাভের মুখ’ দেখতে পায়? “স্বপ্ন গুলো স্বপ্ন হয়েই রয়।” তবে স্বপ্ন দেখাকে তো কেউ আটকাতে পারে না। আটকে দিলে ভ্যান গগ জন্মাতো না। আমরা রোজ স্বপ্ন দেখি, নিজেদের দৈনন্দিন জীবনকে উপেক্ষা করে এর থেকেও সুন্দর একটা জীবনের স্বপ্ন দেখি। যেখানে আমরা সফল, সুন্দর, খুশি। 

বিভাবন প্রযোজিত 'Nothing to say' কয়েকটা জীবন দেখিয়েছে যারা বাধা বিপত্তির মধ্যে থেকেও স্বপ্ন দেখার কথা বলছে। আমার দেখায় ‘Nothing to say’ একটা মুহূর্ত। গঙ্গার পারে বসে অথবা ক্ষেতের সামনের ব্রিজটায় বসে নিজের জীবনের কিছু ভালো, মন্দ, স্বপ্ন, দুঃখ, আনন্দের কথা একা একাই নিজেকে বলেছি এমন বহু মুহূর্ত আছে আমার কাছে। 

‘Nothing to say’ আমার সেই একা ব্রিজে বসে নিজের সাথে কথা বলার সময়কার অনুভূতিটাকে ফিরিয়ে দিচ্ছিলো। Silence itself has a hidden violence or energy, ‘Nothing to say’ এটা feel করায়। দর্শকদের নাটকের অঙ্গ বানিয়ে নিয়ে অবশেষে এটা বুঝিয়ে দেয় যে পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষ নিজ নিজ ক্ষেত্রে নিজেদের জীবন থেকে আরেকটু ভালো একটা জীবনের স্বপ্ন দেখতে ব্যস্ত। তবে সবাই সবার জীবনের কাছে এসে হাত পা দের বেঁধে রেখে ‘আমি ভালো আছি’ গোছের একটা অভিনয় করে যায় প্রতিনিয়ত, তবে মানুষের এই স্বপ্ন দেখার মনটাকে কোনো কিছু দিয়ে বাঁধা যায় কি?

ওই তো আপনি মনে মনেই ‘না’ বললেন।