গত ২১ শে ডিসেম্বর, ২০২৩ দঃ আনুখা সুভাষ সংঘের বাৎসরিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ‘পাঞ্চজন্য’ তাদের নবতম প্রযোজনা ‘মৃতজনে প্রাণ’ নাটকটি নিয়ে উপস্থিত ছিল । নির্ভার মঞ্চে আলো ও আবহে এমন একটা মায়াময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল যা শুধু উপভোগ্য, বোঝানো দুঃসাধ্য । কমেডির মোড়কে এরকম একটা সিরিয়াস বিষয় এবং সাম্প্রতিককে ছুঁয়ে ফেলা বোধহয় নাট্যকার অমল রায় এর পক্ষেই সম্ভব ।
ভন্ড সাধু উদ্ভটাচার্য্য ধনী শিষ্য সুখময় সামন্তের বাড়ি যাবার
পথে একটি করোটি কুড়িয়ে পেয়ে মৃত সঞ্জীবনী মন্ত্রে তাকে প্রাণদান করে । এই প্রাণদান পর্বে উদ্ভটাচার্য্য ও যমরাজের কথোপকথনে যখন সাম্প্রতিক
কিছু তথাকথিত অশ্লীল শব্দ বেরিয়ে আসে তখন দর্শক যেমন প্রাণ খুলে হাসতে পারে, আবার
ভাবনার ও রসদ পান । উদ্ভটাচার্য্য, সুদখোর
সুখময়, অসৎ পুলিশ ,
যমরাজ সবাই একেবারে চেনা চরিত্র । কিন্তু যখন সঞ্জীবনী মন্ত্রে উদ্ভটাচার্য্য প্রায় দুশো বছর আগে
মৃত লোকটিকে বাঁচিয়ে তোলে এবং লোকটি নিজেকে মজনু ফকিরের অনুগামীরূপে চিনতে পারে তখন
নাটকটা হঠাৎ ঐতিহাসিক মাত্রা পেতে পেতে ঘাত প্রতিঘাতে চুড়ান্ত মুহুর্তে পৌঁছে যায় ও
এক এক করে নির্যাতন, নিপীড়ন, অত্যাচারের চিরকালীন চেহারাগুলো দর্শকের সামনে স্পষ্ট হতে থাকে।
উদ্ভটাচার্য্যরূপী সঞ্জয় দে, সুখময় – আশিষ গিরি, পুলিশ অফিসার – গোপাল দাস চরিত্রের সাথে একাত্ম
হতে পেরেছেন । যমরাজের অভিনেতাকে আরো সাবলীলতা আনতে হবে । কনস্টেবল এর অভিনেতার কিছু
কিছু উচ্চারণ কানে লাগে, তবে অভিনয় যথাযথ। শেষে, লোকটি চরিত্রে অনুপ মন্ডল সত্যিই প্রশংসার
দাবি রাখে ।
নাটকটির সম্পাদনা ও নির্দেশনা : রুদ্র রায় । রুদ্র রায়ের বিভিন্ন ধরনের নাটক দেখেছি দেখছি । ধীরে ধীর ওঁর কাজে একটা পরিনত মনস্কতার ছাপ পরিস্ফুট হতে দেখছি । মঞ্চটাকে নির্ভার না রেখে বনের পথের আভাষ দেওয়াও যেত । হয়তো পরিচালক দর্শকের কল্পনা শক্তি উসকে দিতে চেয়েছেন ।
মনোরঞ্জনের সাথে
সাথে এরকম ভাবনার, প্রতিবাদের নাটক আরো বেশি হোক, যাতে মানুষ বাঁচার মানে খুঁজে পায়।
বেহালা
ব্রতচারী মঞ্চে গত
২৭ শে মার্চ,
২০২৪ বিশ্ব
নাট্য দিবস পালনের অনুষ্ঠানে ‘পাঞ্চজন্য’ দলের প্রযোজনা
‘মৃতজনে
প্রাণ’ নাটকটি আবার দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল
। মঞ্চে পশ্চাদপটে
বনপথের দৃশ্য । তার সাথে আলো
ও আবহে একটা গা ছমছমে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল যা দর্শকরা তারিয়ে উপভোগ করেছেন । কমেডি ও সিরিয়াস বিষয় এবং এখনকার সময়টাকে ধরা সব একাকার হয়েছে নাট্যকার অমল রায় এর এই নাটকে । এবং
সেটাকে নাট্যে যথাযথ রূপ দিয়েছেন সম্পাদক ও নির্দেশক রুদ্র রায় ।
ধনী শিষ্য সুখময়ের বাড়ি যাবার পথে গুরু উদ্ভটাচার্য্য
একটি করোটি কুড়িয়ে পেয়ে মৃত সঞ্জীবনী মন্ত্রে তাকে প্রাণদান করে, যমরাজকে ধ্যানে তুষ্ট করে । উদ্ভটাচার্য্য ও যমরাজের এই প্রাণদান পর্ব পরিচালক বেশ মুন্সিয়ানার সাথে প্রয়োগ করে দর্শককে
প্রাণ খুলে হাসিয়েছেন, আবার সাম্প্রতিকের ছবিও তুলে ধরেছেন । উদ্ভটাচার্য্য, সুদখোর
সুখময়, অসৎ পুলিশ ,
যমরাজ সবাই চেনা চরিত্র । সঞ্জীবনী মন্ত্রে উদ্ভটাচার্য্য প্রায় দুশো বছর আগে মৃত লোকটিকে
বাঁচিয়ে তোলার পর লোকটি নিজেকে মজনু ফকিরের অনুগামীরূপে চিনতে পারে । তখন
নাটকে হঠাৎ ঐতিহাসিক সন্ন্যাসী বিদ্রোহের অনুসঙ্গ এসে নাটকটাকে ঘাত প্রতিঘাতে ক্লাইম্যাক্সে নিয়ে যায় ও অত্যাচারের
এক একটা ছবি দর্শকের সামনে তুলে ধরতে থাকে ।
উদ্ভটাচার্য্যরূপী সঞ্জয় দে, সুখময়রূপী আশিষ গিরি, যমরাজরূপী আশুতোষ রায় যথাযথ । লোকটি চরিত্রে
অনুপ মন্ডল আবারও দর্শকের প্রশংসাধন্য হয়েছেন । পুলিশ অফিসারকে আরো মেপে অভিনয় করতে
হবে। কনস্টেবল এর অভিনেতার অভিনয় যথাযথ ।
কিছু গঠনমুলক
পরিবর্তনের ফলে নাটকটি আরো উপভোগ্য হয়ে উঠেছে । তবে নাট্যের গতিছন্দ একটু দ্রুতির দাবি
করে । তারজন্য রসগ্রহনে কোন অসুবিধা হয় না । এ জন্য সম্পাদক ও নির্দেশক রুদ্র রায় এর
অভিনন্দন প্রাপ্য । ওঁর কাজ আরো বেশি
দর্শকের কাছে পৌঁছাক, কারন একটা পরিনত দায়বদ্ধতা
ওঁর কাজে পরিলক্ষিত হয় ।