বিমূর্ত নাট্যদলের নতুন নাটক "বিসর্জন" এর প্রথম মঞ্চায়ন হলো জ্ঞান মঞ্চে, পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে, ১৬ই ডিসেম্বর, সহজ আয়োজিত "সহজিয়া" নাট্যোৎসবে। এই নাটক লিখেছেন সংলাপ রায়, নির্দেশনায় অনিরুদ্ধ গুপ্ত, আবহ পরিচালনায় সুদীপ্ত ভট্টাচার্য, দীপ্তার্ক ধর। মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন স্নেহাশীষ ঘোষ, অন্যান্য চরিত্রে কিশোর বিশ্বাস, সায়ন দাশ, সায়ন বিশ্বাস, নিকিতা নাথ, শায়েরী দে, রুদ্রদেব পাল, স্পন্দন কুন্ডু এবং আরো অনেকে। এই নাটক দেখে দর্শকের মুখের চওড়া হাসি এবং করতালির জোর কলাকুশলীদের আরো উৎসাহিত করেছে আগামী দিনের জন্য। তাছাড়া, এই নাটকের গানের সাথে, নাচের সাথে তালে তাল মিলিয়েছেন দর্শকাসনে বসে থাকা প্রতিটি মানুষ।
"এই ধরণের লাইভ পারফরম্যান্স দেখা সবসময়ই একটি উপহার এবং বিশেষ করে বিসর্জন নাটকে গল্প-অভিনয়-লাইভ মিউজিক আমাকে অভিভূত করেছ। ধারণাটি অত্যন্ত হৃদয় মর্মস্পর্শী এবং গভীর ছিল এবং সবশেষে প্রত্যেকেরই অভিনয় অসাধারণ।" - ডরোথি চ্যাটার্জি, চাকুরীজীবী।
"দারুন একটি নাটক দেখলাম যথেষ্ট ভালো একটা কনসেপ্ট আর যাত্রা নিয়ে নাটক। এই নাটকে যিনি দুগ্গার চরিত্রে অভিনয় করেছে অসাধারণ অসাধারণ করেছেন প্রথম থেকে শেষ অবধি।" - জয়িতা বিশ্বাস।
"প্রথমেই ' বিমূর্ত ' নাট্যদল কে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন..'বিসর্জন' - এর মতো একটি সুন্দর প্রযোজনা উপহার দেওয়ার জন্যে..
প্রথমেই সাধুবাদ জানাই এই নাটকের নাট্যকার কে এমন একটি বিষয় নির্বাচনের জন্য..বাংলা রঙ্গমঞ্চের ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ কে তুলে ধরেছেন তিনি তাঁর লেখায়..একটা সময় ছিল যখন যাত্রা পালায় নারী চরিত্রের রূপদান করতেন পুরুষ অভিনেতা..অসম্ভব কদর ছিল তাঁদের, কারণ নিজস্ব সত্ত্বা কে ভেঙেচুরে অভিনয় করতে হতো তাঁদের..তারপর সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এই ধারার ও পরিবর্তন ঘটলো,নারী চরিত্রে নারীই এগিয়ে এলেন অভিনয়ের জন্যে...দর্শকের চাহিদা ও সেই খাতেই বইতে শুরু করলো...এবং হঠাৎ করেই নারী চরিত্রে অভিনয়কারী সেই পুরুষ অভিনেতা দলের কাছে অবাঞ্ছিত হয়ে উঠতে শুরু করলেন..সেই বিশেষ সন্ধিক্ষণ এবং নটী রূপী এমন ই এক পুরুষ অভিনেতা ' দুর্গা ' -র মর্যাদার বিসর্জন ই এই নাটকের প্রধান উপজীব্য বিষয়..
নাটকের নির্দেশক এর জন্যে কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়, অসম্ভব মুন্সিয়ানার সঙ্গে প্রতিটি দৃশ্য কে মঞ্চায়িত করেছেন তিনি..প্রথম ও শেষ দৃশ্য কে যেভাবে মিলিয়েছেন তিনি , সত্যিই বাহবা দিতে হয়..
কলাকুশলীরা এই নাটকের সম্পদ..প্রত্যেকে তার নিজের ভূমিকায় একশো শতাংশ দিয়েছেন..তবুও 'দুর্গা'র চরিত্রে অভিনয়কারী স্নেহাশিস এর নাম আলাদা করে বলতেই হবে..দুর্গার সাথে আমি ও কেঁদেছি..
নাটকে হাস্যরস ও ভীষণ সুন্দর ভাবে পরিবেশিত হয়েছে..একদম নির্মল হাসি...এবং সেই কমিক চরিত্র অত্যন্ত সাবলীলভাবে অভিনীত হয়েছে ... ভাঁড়ামির কোনো ছোঁয়া নেই তাতে..নাটকের প্রত্যেক অভিনেতার জন্য অন্তহীন শুভেচ্ছা রইলো...
Last but not the least.. নাটকের আবহ সঙ্গীত..খুব খুব ভালো লাগলো..সঙ্গীত নাটকের গতি কে কখনোই ব্যাহত করেনি, বরং অর্থবহ করে তুলেছে.." - মৌসুমী পাল, চাকুরীজীবী নাট্যপ্রেমী এবং আবৃত্তিকার.
এই নাটক সেই সময়কার যখন বাংলা যাত্রায় ক্রস-ড্রেসারদের দিন ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে, এবং মেয়েরা যাত্রায় প্রবেশ করছেন। বাংলা যাত্রা, বাংলার একটি ঐতিহ্যবাহী লোক নাট্যরূপ। সেখানে ক্রস-ড্রেসিংয়ের একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক তাৎপর্য রয়েছে। এমন এক সময় ছিল, যখন যাত্রার মঞ্চে মেয়েদের ওঠার চল সে অর্থে ছিল না, অথচ এমন অনেক কথা, গল্প ছিল যা নারীর মুখ ছাড়া, বেশ ছাড়া সম্ভব ছিল না। অগত্যা সেই অভিনয় তখন ছেলেরাই মেয়ে সেজে করে যাকে বলে ক্রস-ড্রেসিং। যাত্রায় ক্রস-ড্রেসিং চরিত্রগুলি কেবল পোশাকের পরিবর্তনের চেয়ে বেশি প্রতীকী; তারা প্রায়শই বর্ণনার মধ্যে একটি রূপান্তর বা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ফুটিয়ে তোলে।
এমনই একজন মানুষ দুর্গাপদ বিশ্বাস, এই নাটকের মূল চরিত্র; তৎকালীন স্বনামধন্য শিল্পী, যিনি মেয়ে সেজে দর্শকদের মন জয় করেছিলেন। তাঁর ছোট থেকে বড় হওয়া, শিল্পী হয়ে ওঠা এবং সেই শিল্পীর পরিণতি - এই নিয়েই বিসর্জন নাটক। এই নাটকে সেই সময়কার পালাগান, তালে তালে নাচ, সেই সময়ে যাত্রার দেখার আমেজ, এই সবই যথাযথ ব্যবহৃত হয়েছে।
আগামী দিনে এই নাটক অনেক অনেক এগিয়ে যাক। বারবার এই নাটকের মঞ্চায়ন হোক, দর্শকের মনোরঞ্জন হোক। এই নাটকের আগামী অভিনয় ১৪ই জানুয়ারি, রবিবার, জ্ঞান মঞ্চে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন