সোমবার, ২৪ জুলাই, ২০২৩

বিবাহ ও দাম্পত্যকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার নাটক "অপশন"

ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠা দাম্পত্য সম্পর্কের মূলে কি রয়েছে ব্যক্তিগত চাহিদা? আমিত্ব? নাকি বিশ্বায়নের প্রভাব? যে নাতি বা নাতনি দাদু-দিদার ৫০ বছরের বিবাহ বার্ষিকী পালনকে ঘিরে সেলফি তুলে সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট করে, সে নিজেই হয়ত তার কোনও সম্পর্কের স্থায়িত্ব সম্পর্কে সন্দিহান! সেটা প্রেম হতে পারে, বা বিবাহ। বিয়ের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ডিভোর্স এখন শিরোনামে জায়গা করে নিচ্ছে। সংসার, বিয়ে, দাম্পত্যকে অনেকেই এড়িয়ে যাচ্ছেন। অনেকের কাছেই এ সম্পর্ক বোঝা,বাঁধন। কসবা অনুপ্রাস নাট্যগোষ্ঠীর নতুন নাটক ‘অপশন’এ এই বিষয়গুলিকেই পরপর যুক্তি সহকারে বিশ্নেযণ করে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। কোনও পক্ষপাত নয়, বরং আমাদের চিরকালীন মানসিকতা, যাকে আমরা ‘সেকেলে’ বলে এখন দেগে দিই এবং বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গী, যা ‘জেন নেক্সট মেন্টালিটি’নামে বিস্তার লাভ করছে, দু’টি মানসিকতাকেই পাশাপাশি রাখা হয়েছে। দু’পক্ষেরই বাস্তবতা, প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। দু’টি পরস্পর-বিরোধী মত রেললাইনের মতো পাশাপাশি এগিয়ে চলেছে নাটক জুড়ে। পাশাপাশি রয়েছে, কিন্তু মেলেনি। মত-অমত দর্শকের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। গত ২১ জুলাই মধুসূদন মঞ্চে মঞ্চস্থ হল নাটকটি। নাটকটির নাট্যকার- নির্দেশক সৌভিক গাঙ্গুলি। নাটকের মঞ্চ পরিকল্পনা, আলোক পরিকল্পনাও তাঁর। নাটকে একটি সুন্দর গানও রয়েছে তাঁর কন্ঠে। অবসরপ্রাপ্ত এক পিতা তার বিবাহযোগ্যা মেয়ের জন্য সুপাত্রের সন্ধান করছেন। আগেকার দিনে এ কাজটা করত ঘটক। এখন সময় বদলেছে। মানুষের দৃষ্টিকোণও বদলেছে। ঘটকের পরিবর্তে কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা মেয়ের বিয়ের জন্য নাম রেজিস্ট্রেশন করিয়েছেন এক ম্যাট্রিমনিয়াল সাইটে। কোম্পানির নাম ‘এম আই বি’ ওরফে ম্যারেজ ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো। নামটি খেয়াল করবার মতো। গল্প জমে ওঠে যখন এম আই বি-র জনৈক এজেন্ট পিতা রমেন চৌধুরির বাড়িতে এসে হাজির হয়।

তার পরেই শুরু হয় বিয়ে, দাম্পত্য নিয়ে এজেন্টের তথাকথিত ‘ইনভেস্টিগেশন'। পিতার সামনে তিনি তুলে ধরতে থাকেন একের পর এক "অপশন" অর্থাৎ বিকল্প। কখনও তিনি বলেন কী ধরনের পাত্র পেলে তাঁর মেয়ে সুখী হবে, কখনও আবার সমীক্ষা পেশ করে জানায়, কী ধরনের পাত্র আজকালকার মেয়েরা পছন্দ করে। পিতা ক্রমশ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। মেলাতে পারেন না মানুষের বদলে যাওয়া পছন্দ-অপছন্দ, বর্তমান সময়ের জীবন-চাহিদা, দাম্পত্য-জটিলতাকে। নাটকের চরিত্রগুলি খুঁজতে চেয়েছে বর্তমান দাম্পত্যের জটিলতার শিকড়টিকে। ‘চাহিদা যেমন অপশনের জন্ম দেয়, তেমনই অপশনও চাহিদা বাড়িয়ে তোলে। হাসির নাটকে হঠাতই এক গভীর সমাজবাস্তবতা জেগে ওঠে। আবার পিতা রমেন চৌধুরি যখন বলে ওঠেন, সংসার করা চাট্টিখানি কথা নয়, মনটাকে উদার করতে হয়, সেল্ফ-ওরিয়েন্টেড মেন্টালিটিগুলো থেকে বেরোতে হয়’ তখন আমাদের সযত্নলালিত, বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্য- সংস্কৃতি-কৃষ্টির যেন ধারক-বাহক হয়ে ওঠেন কন্যাদায়গ্রস্ত রমেন চৌধুরি। নাটকের মূল রস লঘু। মজার মোড়কে কমেডি ঢঙই ‘অপশন’-এর চলন। এ খানেই নাট্যকার সৌভিক গাঙ্গুলির কৃতিত্ব। কোথাও তিনি ঢিল দেননি। টানটান রেখেছেন চিত্রনাট্য ও তার গতিবেগ। নাটকের একদম শেষ পর্বে একটি সুন্দর গানকে কেন্দ্র করে যে রোমান্টিক দৃশ্যটি নির্মাণ করা হয়েছে, সেটি নাটকটিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে চাঁদোয়া পড়ে যাওয়া দর্শকমনে প্রেম ভাব আরও জাগিয়ে দেয়। মন ভালো করা এক অনুভূতি নিয়ে আসন ছাড়েন দর্শকেরা।

নির্দেশনার কাজটি সযত্নে করেছেন সৌভিকবাবু। নেমপ্লেট হিসেবে বিয়ের কার্ডের ব্যবহার, মঞ্চ জুড়ে চেন লাইটের বাহার, যা গোটা নাটক জুড়ে ক্রমাগত পরিবর্তনশীল, মঞ্চ নির্মাণে বিবাহ সম্পৃক্ত আল্পনা, কুলো, চাঁদোয়া, পাল্কির প্রয়োগ, সানাইয়ের সুর— সব মিলিয়ে পর্দার আবরণটুকু সরতেই ঝকঝকে, চোখ-ধাঁধানো, দৃষ্টিনন্দন দৃশ্যসজ্জায় তাক লেগে যায়। মঞ্চ পরিকল্পনায় নির্দেশকের বিবিধ রঙের ভারসাম্যময় প্রয়োগ-পরিকল্পনা তারিফযোগ্য। পিতা রমেন চৌধুরির চরিত্রে অনুপ সাহা এবং এম আই বি-র এজেন্ট প্রবীর আদিত্য— এই দুজনই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নাটকটির চালিকাশক্তি। মাত্র দুটো চরিত্রের কথোপকথনের ওপর ভর করে নাটকটি এগিয়ে চললেও সংলাপের বৈশিষ্ট্য এবং মনোগ্রাহী নির্দেশনার গুণে তাতে কোথাও বিরক্তি বা বিরতির ভাব জাগে না। কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার চরিত্রে অনুপ সাহা দুরন্ত অভিনয় করেছেন। তাঁর কমেডি টাইমিং একাধিক বার দর্শকাসনে হাসির রোল তুলেছে। চরিত্রের উদ্ভ্রান্ত-বিভ্রান্ত দশা ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রেও তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। এজেন্টের চরিত্রে প্রবীর আদিত্য যথাযথ। তবে নাটকটিতে তাঁর আরও সাবলীল অভিনয় দাবি করে। যেহেতু নাটকের বেশিরভাগ সংলাপই তাঁর মুখে। এজেন্টের সহকারীর ভূমিকায় বিপুল রায় যে-টুকু করেছেন, সে-টুকুই যথেষ্ট এবং দুর্দান্ত।

নাটকে তিনি আসলে একটি বিমূর্ত চরিত্র। তাঁর মাধ্যমে কর্পোরেট কোম্পানির পি পি টি প্রেজেন্টেশনের এক মজাদার ভঙ্গি তুলে ধরেছেন নির্দেশক। এজেন্টের পেশ করা উপর্যুপরি অপশন অনুসারে বার বার বিভিন্ন অবতারে সেজে উঠে জায়গায় জায়গায় কমিক রিলিফ দেওয়ার কাজটি তিনি নিপুণভাবে সেরেছেন। নায়িকা নীলাক্ষীর চরিত্রে পূজা দত্ত মানানসই। এই চরিত্রের স্বাভাবিক দৃঢ়তা তিনি ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছেন। নিজে চাকরি করে প্রেমিককে সামাজিক আশ্বাস ও অর্থনৈতিক আশ্রয় দিতে গেলে যে চারিত্রিক বলিষ্ঠতার প্রয়োজন, সে অভিনয়ে তাঁর কিঞ্চিৎ ঘাটতি রয়েছে। প্রেমিকের চরিত্রে প্রণব দাসের মঞ্চে স্থায়িত্ব খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও তাঁর মুখ দিয়েই নাটকের সার কথাটি বলিয়ে নিয়েছেন নাট্যকার।  সম্পর্কে ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট’ ও ‘কম্প্রোমাইজ’-এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা খুব কম শব্দে সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে এ নাটকে। এই দু’টো শব্দই যে আসলে সম্পর্করক্ষার চাবিকাঠি, তা-ও বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে অভিনয়ে সুযোগ না পেলেও আলোক প্রক্ষেপণে প্রণব দাস কেরামতি দেখিয়েছেন। বহুল জনপ্রিয় কৌন বনেগা ক্রোড়পতির থিম মিউজিকে স্বল্প আয়োজনে যে আলোর খেলা তিনি দেখিয়েছেন, তার জন্য তাঁর সাধুবাদ প্রাপ্য। নাটকে আবহ নির্মাণ করেছেন বিপুল রায়। নাটকের বেশ কয়েকটি জায়গায় গানের ব্যবহার বেশ নতুন রকমের। ‘অপশন’ স্বল্প দৈর্ঘ্যের নাটক। তবে সময়সীমায় ছোট হলেও, নাটকটি গুরুত্বে ও প্রয়োগে কখনওই ছোট নয়। মনে দাগ কেটে যায়। রেশ রয়ে যায়। নাটকটির পরবর্তী অভিনয় ২৭ জুলাই, তপন থিয়েটারে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন