বুধবার, ২৪ মে, ২০২৩

প্রসেনিয়াম আর্ট সেন্টারে চারটি দলকে নিয়ে কোলকাতা রঙ্গশীর্ষ পালন করলো "সেলিব্রেশন অফ থিয়েটার"

 

'কোলকাতা রঙ্গশীর্ষের' আয়োজনে ,- 'প্রসেনিয়াম আর্ট সেন্টারে' ,গত ২০ মে ২০২৩ এ  পুরো সন্ধ্যা জুড়ে - ভিন্ন স্বাদের চারটি গল্প নিয়ে চারটি নাটিকার উপস্থাপনা ,দর্শকের মনে এক আলাদা স্বাদ এনে দিয়েছিল ৷ আয়োজক দলের বিশিষ্ট অভিনেতা , মনোজিৎ মিত্রের অভিনয়ের মাধ্যমে । প্রথম গল্প : ঘ্রাণ ৷ পরিচালনায় : পৃথা ভট্টাচার্য্য ৷ গল্প : অর্পিতা দাশগুপ্ত ঘ্রাণ অর্থাৎ গন্ধের মাধ্যমে ,যেমন , জামার গন্ধ , সেটা নতুন নাকি ঘেমো ? ফুলের গন্ধ-সেটা কী ফুল ? তা তাজা নাকি বাসি ?জিনিসপত্রের গন্ধের সাথে , মানুষের সাথে সম্পর্কের গন্ধটাও পাওয়া যায় ৷ হ্যাঁ , লুকিয়ে রাখা ঘুষের টাকা থেকে পচা ডিমের গন্ধও ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে ৷ জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষটি , যদি ভালোবাসার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে , সেখান থেকেও যে শিল্পীর কাছে মেছো গন্ধ আসে ৷ আর,এই সব দূর্গন্ধ থেকে পালিয়ে আসতে, 'আতর' ই কি তার একমাত্র সমাধান ? নাকি! অসহ্যকর হয়ে ওঠা  চারপাশ ,তাকে উন্মাদনার দিকেই ঠেলে দেয় ? ঘ্রাণ' নামক ছোট্ট নাটিকার মাধ্যমে , অল্প কথায় বাস্তব পরিস্থিতি উঠে এল , শিল্পী মনোজিৎ মিত্রের অসাধারণ অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ৷


    দ্বিতীয় নাটক : দুই পাখির ইচ্ছা পূরণ ৷ নাট্য দল : নট আ স্টোরিটেলার ৷ ভাবনা : অভিক ভট্টাচার্য্য ৷ অভিনয়ে : অহনা , অস্মিতা ৷ আমরা সবাই এটাই ভাবি যে, নদীর ওপারে সমস্ত সুখ, আর আমি এপারে দাঁড়িয়ে , সব থেকে দু:খী এই পৃথিবীতে ৷এরকম ধারণা শুধু যে মানুষেরই ,তা নয় ৷  দুই পাখির মধ্যেও একই ধারণা ৷ রবিঠাকুরের তোতাকাহিনী কবিতার কিছু লাইন দিয়ে দ্বিতীয় উপস্থাপনার সূচনা ঘটল ৷ সোনার খাঁচায় থাকা পাখিটি অফুরন্ত খাবার পাওয়ার সাথে , আধুনিক যুগে সে 'মোবাইলে' 'নেট' ও ঘাটে ৷ সে আবার এক মুখোশধারী 'বস্ ' নামক চরিত্রের অধীনস্ত ৷ এদিকে , বনের সবুজ পাখী স্বাধীনভাবে উড়ে বেড়ায় , কিন্তু খাবারের সন্ধানে তাকে লড়াই ও করতে হয় ৷ উভয় উভয়কে দেখে ভাবে, অপরজন কত্ত না সুখে আছে ৷ তারা তাদের অবস্থার বদল ঘটাতে চাইল ৷ এদিকে ,বনের পাখী খাঁচার মধ্যে স্বাধীনভাবে উড়তে গিয়ে ,ব্যাস্ - অল্প স্থানে আর পারল না উড়তে ৷ ওদিকে সোনার পাখী , খোলা জায়গা পেয়ে যেই না উড়তে গেল , বহু সময়ের অনভ্যাসে আর পাখনা ঝাপটাতেই পারল না ৷ সম্মিলিত গান 'নদীর এপার.....' অসাধারণ শ্রুতিমধুর উপস্থাপনা , তার সাথে , সম্পূর্ণ গল্পে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার সুমধুর ভালোলাগা উপহার পেল দর্শক ৷

    গিরগিটির স্বভাব মানুষের চরিত্রের মধ্যেও যে ছড়িয়ে পড়ে , সেটাই দেখিয়ে দিল কয়েকজন ক্ষুদে শিল্পী ৷ পুলিশ নামক চরিত্রের মধ্য দিয়ে - ড: তাপস দাসের পরিচালনায় "এসো নাটক শিখি" নাট্যদল, এ্যান্টন চেকোভের লেখা গল্পের নাট্য রূপে দেখা গেল। পুলিশ চোর ধরার কাজ না করে নিজেই বিনাপয়সায় ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয় ৷ একটা বাচ্চা যখন একই কাজ করে , তখন সেই পুলিশ অনবরত দমাদম লাঠির মার দেয় ৷ এদিকে , পুলিশ যখন জানতে পারে যে বাচ্চা টা কমিশানারের নিজের ছেলে, ব্যাস্ - আর কি ! চরিত্রের রং টা পুরোটা যেন বদলে যায় ৷ আর শিশুর মনতো জটিল নয় , সেই চোখে আঙুল দিয়েই পুলিশের আসল চরিত্র দেখিয়ে দিল - 'গিরগিটি'র চরিত্র ৷ সুপরিচিত কয়েকটি গানের সুর মিলিয়ে গল্পানুসারে নাটকে তিনটি গান বেশ প্রাসঙ্গিক ৷


    শেষ গল্পে , রূপ ও রং থিয়েট্রিক্যাল নাট্যদলের নাটক 'বাঁশী ' ৷ বন্দনা মিত্রের লেখা ,মনোসিজের পরিচালনায় ,অভিনেত্রী মোহনার একক অভিনয় , অসাধারণ ৷বেশীরভাগ মানুষ , জিনিসপত্র ভাগাভাগির সময় টাকার অঙ্কে সবথেকে দামী যে জিনিস ,তা ছিনিয়ে নেবার চেষ্টাই করে ৷ কিন্তু , গল্পের একক চরিত্রাভিনেত্রীর নজর পড়েছিল - মরচে ধরা বাক্সে রাখা , সস্তা দামের একটা বাঁশীর উপর ৷ না , টাকার অঙ্কে , তার কোনো দামই যে নেই ৷ কিন্তু , সেই বাঁশিই যে , এই বাড়ির পূর্বপুরুষ ত্রিনয়নী মানে , নয়ন বৌ - শুধুমাত্র বাঁশীকেই আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিল ৷ ঘরের সমস্ত কাজ মিটিয়ে , শ্বশুরবাড়ির , স্বামীর কাছ থেকে বারংবার মারধর খেয়ে , অপমান সহ্য করে , এই বাঁশীই ছিল নয়ন বৌ এর এক এবং একমাত্র সঙ্গী ৷ যে ঘরে দাঁড়িয়ে , আজকের শিল্পী , অত্যাচারিত  বাঁশী বাদিকার কথা বলছে , সেই ঘরে বসেই নয়নবৌ পরিস্থিতি মতন বাঁশীতে সুর বাজাতেন ৷ গল্পের প্রয়োজনে , আরেকটি চরিত্রের উপস্থাপন ঘটলেও , এই অভিনেত্রীই ছিলেন - এই গল্পকথার একমাত্র কথক ৷ এই সুন্দর সন্ধ্যের , সমগ্র অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন - পৃথা ভট্টাচার্য্য । 

    রিভিউ- শুভশ্রী দত্ত



    কোন মন্তব্য নেই:

    একটি মন্তব্য পোস্ট করুন