শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬

বারো থেকে আরো একধাপ - টালিগঞ্জ স্বপ্নমৈত্রী

     বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে সুষ্ঠভাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা খুবই দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে ক্রমে ক্রমে। একদিকে যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাব অন্যদিকে দৈনন্দিন জীবনে শত প্রলোভনকে দূরে সরিয়ে রেখে নাটকের অভিনয় করা এবং দর্শককে নাটক দেখার উৎসাহ দেওয়া খুবই কঠিন। যারা এই কঠিন কাজটি নিজেদের দায়িত্বে সুন্দরভাবে করে যাচ্ছে বছরের পর বছর, তাদের মধ্যে টালিগঞ্জ স্বপ্নমৈত্রী অন্যতম। সারা বছর তারা নাটকের বিভিন্ন আঙ্গিক নিয়ে চর্চা করে, কর্মশালা করে এবং সর্বোপরি তারা নাট্য উৎসব করে। তাদের মৈত্রী উৎসব তো যতদিন যাচ্ছে নাট্যমোদী দর্শকের কাছে খুবই জনপ্রিয় হচ্ছে বলে মনে হয়। টালিগঞ্জ স্বপ্নমৈত্রী এবার বারো বছরে পা দিল। 'বারো বছর' শুনলে মনে হয় শৈশব এখনো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে জীবনে, কিন্তু স্বপ্নমৈত্রী তা ভুল প্রমাণ করে দিয়েছে। যতদিন যাচ্ছে তাদের দৃপ্ত পদক্ষেপ আগামী প্রজন্মের কাছে একটা শিক্ষণীয় ব্যাপার হয়ে থাকবে এই আশা পোষণ করি। বারো বছরের জন্মদিনে তারা আয়োজন করেছিল "স্বল্পদৈর্ঘ্য এবং অনু নাটকের উৎসব" গত ২৯শে মার্চ তৃপ্তিমিত্র সভাগৃহে। কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রকের অর্থানুকূল্যে আয়োজিত উৎসবের পাশাপাশি ছিল বিশ্ব নাট্য দিবসের উদযাপন। নাট্য দিবসের বার্তা পাঠ করে সূচনা হয় উৎসবের। 



    সন্ধ্যার প্রথম নাটক ছিল 'গোবরডাঙ্গা আকাঙ্ক্ষা' প্রযোজিত নাটক "পেনা পালালো"। মূল নাটক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের "ভীম বধ" নাটকের ছায়া অবলম্বনে এই নাটক। সকলের প্রাণবন্ত অভিনয়ে দর্শক সাধারণ কে মুগ্ধ করে দিয়েছে। দ্বিতীয় নাটক গরলগাছা স্বপ্ন সৃজন এর "দেবী" প্রত্যেকের অভিনয় যথাযথ, তবে বাইরের থেকে প্রম্পট করাটা একটু দৃষ্টিকটু লেগেছে। আরো একটি ব্যাপার— মঞ্চে রাখা 'প্রপস' ঠিকমতো ব্যবহার না হওয়া। দুজন লোক মদ পান করছে তাদের জলের বোতল থাকা সত্ত্বেও তারা জল ব্যবহার করছে না অথচ জলের বোতলটি সামনে রয়েছে এটা ঠিক মেনে নেওয়া গেল না।
তৃতীয় প্রযোজনা ছিল "টালিগঞ্জ হিজিবিজবিজ নাট্য কেন্দ্র এর নাটক "এক খেয়ালি রাজার কান্ড"। এই নাটকটি আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে কতখানি উপযোগী তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে-বিদেশে রাষ্ট্র নায়কদের আজব খেয়ালে উলুখাগড়ার মতো সাধারণ মানুষের প্রাণ যে  ওষ্ঠাগত হয়ে উঠছে ক্রমাগত, তারই সাক্ষ্য বহন করছে আজকের সংবাদ মাধ্যম। এই নাটকে দেখলাম তারই প্রতিচ্ছবি। প্রত্যেকের অভিনয় খুবই ভালো। চতুর্থ নাটক ছিল চন্দ্রদীপ নাট্যদলের নাটক "কোন এক যতীনের গপ্পো"। এক সত রিকশাওয়ালা ও তার ছেলের মধ্যে টানাপোড়েন এই নাটকের বিষয়। মোটা দাগের  অভিনয় হলেও প্রত্যেকের অভিনয় ভালোই উপভোগ করেছেন দর্শকরা।

    এদিন সন্ধ্যায় টালিগঞ্জ স্বপ্নমৈত্রী নিবেদন করল তাদের নবতম প্রযোজনা "বিজ্ঞাপন"। এটিই ছিল তাদের প্রথম অভিনয়। বাপি কুণ্ডু রচিত এই নাটকের সামগ্রিক পরিকল্পনা ও পরিচালনা ইন্দ্রনীল মুখার্জী। এ নাটক আমাদের সমাজের কদর্য রূপটা তুলে ধরেছে। আমরা সাধারণ মানুষ সাময়িক সুখ পাওয়ার আশায়  সমাজে ছড়িয়ে থাকা নানা প্রলোভনের প্রতি আকৃষ্ট হই। কিন্ত ভুলে যাই এর একটা ভয়ানক পরিণতি অপেক্ষা করে থাকে হিংস্র শ্বাপদের মত আমাদের ঘাড়ে লাফিয়ে পরার জন্য। তখন মানুষের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিসহ। যা নরক যন্ত্রণার সামিল। এই নাটক তারই কথা বলে। প্রত্যেকের অভিনয় খুবই সুন্দর, তবে ভগবানের চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন তাঁকে আরেকটু চরিত্রের প্রতি যত্নশীল হতে হবে।

    সব শেষে প্রকাশিত হল তাদের বার্ষিক পত্রিকা। নাট্যবন্ধুদলের শুভেচ্ছা পত্র, প্রবন্ধ অণুনাটক  সব মিলিয়ে খুব ভালো হয়েছে তাদের ওই পত্রিকা। সবশেষে স্বপ্নমৈত্রীকে সাধুবাদ জানাতে হয় তাদের কর্মকাণ্ডকে। আশা রাখি তারা বারো থেকে আরো বড় হবে এবং বাংলা নাট্য জগতকে সমৃদ্ধ করবে।