
থিয়েটার হল দৃশ্যকাব্যের খেলা। প্রতিমুহূর্তে কাব্য ( টেক্সট ) যেন দৃশ্যে রূপান্তরিত হতে থাকে। এটা একটা নাট্য নির্মাণের প্রসেস। গত 27 শে ফেব্রুয়ারি মিনার্ভা থিয়েটার হলে অভিনীত হল মহাকবি ভাস রচিত 'কর্নভরম' অনুসরণে আড়িয়াদহ নাট্যপীঠের নতুন নাটক "কর্ণ রিটার্ন"। যেখানে নাটকের প্রথম দৃশ্য থেকে শেষ দৃশ্য অব্দি আলো, আবহ, প্রপার্টিস, শ্যাডো ও হিউম্যান ফিগারের ব্যবহার করে নির্দেশক একটির পর একটি দৃশ্য তৈরি করে গেলেন।

এটি একটি কনটেম্পোরারি ক্লাসিক নাট্যনির্মাণ। মহাভারত (ক্লাসিক) ও বর্তমান ভারত (কন্টেম্পরারি) সময়কে পাশাপাশি মঞ্চ উপস্থাপনার চেষ্টা করা হয়েছে । মহাবীর কর্ণ একজন মহাভারতের চরিত্র হলেও, নাটকের নির্দেশক তার নাট্য ভাবনার মধ্য দিয়ে তাকে বারে বারে, এই ভারতে, এই সমাজে ফিরিয়ে এনেছেন। এখানেই তার ভাবনার কৃতিত্ব। যুগে যুগে কর্ণদের উপর যেভাবে অন্যায়, অবিচার হয়ে আসছে, তাদের যেভাবে বারে বারে বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত হতে হয়েছে, তার ছবি নাটকের প্রতিটা দৃশ্যে ফুটে উঠেছে। এখানে প্রথম ভাগে মহাকবি ভাস রচিত কর্ণভারমকে অর্থাৎ কর্ণের জীবন, সংগ্রাম, আত্মত্যাগকে তুলে ধরা হয়েছে । এই অংশটিতে ক্লাসিক্যাল থিয়েটারের ফরম্যাটকে অনুসরণ করা হয়েছে।
এই পর্বের শেষে অর্থাৎ কর্ণের যুদ্ধ যাত্রার পরেই নাটকটিতে সম্পূর্ণ উল্টো দৃশ্য দেখা যায় । নির্দেশক এখানেই চমক দেখান । নাটকের মঞ্চ, পোশাক ,আবহ, প্রপার্টিস সবকিছুতে মুহূর্তের মধ্যে পরিবর্তন ঘটে যায়। সব কিছু মুহূর্তের মধ্যে আধুনিক হয়ে ওঠে। পরিচয় হয় এ যুগের কর্ণ, টাইমপাসের সঙ্গে। নামটা ইন্টারেস্টিং তাই না ? এরপরে কি হল জানতে হলে আপনাকে এই নাটকের পরবর্তী অভিনয় দেখতেই হবে।

নাটকের প্রথম দৃশ্য মানে কুন্তীর কর্ণকে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার দৃশ্য থেকেই পরতে পরতে রয়েছে চমক। রিয়েলিটি শো গুলির আসল চেহারা সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন নির্দেশক । মিউজিক ও আলোর যুগলবন্দি একাধিক অসাধারণ দৃশ্য তৈরি করে। খুব সুন্দরভাবে আলো ও মিউজিককে নির্দেশক ব্যবহার করেছেন এই নাটকে । আর খুব ভালো লেগেছে এযুগের কর্ণ মানে টাইম পাস এবং তার সাথীর গলায় অসাধারণ লাইভ সং। এছাড়া প্রপাটিস ও স্যাডোর ব্যবহার করে বেশ কয়েকটি সুন্দর দৃশ্য তৈরি করা হয়েছে রয়েছে । রয়েছে কালারিপয়ট্টু ও মার্শাল আর্টের প্রয়োগ। এই দুটিকে ব্যবহার করে যেভাবে কর্ণের বড় হয়ে ওঠাতে দেখানো হয়েছে, এক কথায় লাজবাব ।
প্রথম পর্বে মঞ্চে নীল,লাল প্রভৃতি রঙের কাপড়কে ব্যবহার করে কি সুন্দর দৃশ্য তৈরি করা হয়েছে, তেমনি দ্বিতীয় পর্বে তিনটি কিউবকে বারে বারে নানা ভাবে, নানা রূপে যেভাবে ব্যবহার করে একাধিক দৃশ্য তৈরি করা হচ্ছিল, এগুলো নির্দেশকের মুন্সিয়ানাকেই তুলে ধরে। ব্যাকড্রপটি নাটকটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করছিল ।
.jpeg)
নাটকের টাইটেল সং লিখেছেন রাধা কৃষ্ণদেব নস্কর। সুর ও কন্ঠ সুরজিৎ চক্রবর্তী । মিউজিক অ্যারেঞ্জ পরিচয় মাঝি । আলো শিলাদিত্য বড়াল এবং আবহ প্রক্ষেপনে সম্রাট মন্ডল। ব্যাকড্রপ ঈশান কর্মকার। প্রতিটি অভিনেতা ও অভিনেত্রী তাদের চরিত্রগুলি ফুটিয়ে তোলার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন । কর্ণ ও জিষ্ণুর চরিত্রে সুরজিৎ চক্রবর্তী, শল্য ও টাইমপাসের চরিত্রে রৌনক চৌধুরী, ইন্দ্র ও মিউজিক কোম্পানির মালিকের চরিত্র অসীম ভট্টাচার্য, সূত্রধর কৃষ্ণা ও পাগলির চরিত্রে পৃথা ভট্টাচার্য, কুন্তি ও তাপসীর চরিত্রে অনামিকা সাহা, কর্ণের প্রতিপক্ষ ও রিয়েলিটি শোয়ের জাজের চরিত্রে শান্তনু মন্ডল, ঐ রিয়েলিটি শোয়ের জাজের চরিত্রে রাখি সুকুল, কর্ণের বাল্যকালের চরিত্রে শুভজিৎ। যারা এখনো এই নাটকটি দেখেননি তাদের অবশ্যই একবার নাটকটি দেখার অনুরোধ রইলো।
আপনাদের নাট্য সমালোচনা আমাদের E-mail করুন - rangatheatre2020@gmail.com
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন